President

এমন কোনো পাপ ছিলো না- যা ইসলামপূর্ব যুগে আরবে হতো না। শিরক, মানবহত্যা, নবজাতক কন্যাশিশু জীবিত কবরস্থকরণ, পিতার মুত্যুর পর আপন সৎমাকে উত্তরাধিকার সম্পদ হিসেবে গ্রহণ, সুদসহ সব ধরনের পাপাচার জাহেলি যুগে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো।

কন্যা শিশুর বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও হরণ করা হয়েছিলো সে যুগে। নারীদের অধিকার বলতে কিছুই ছিলো না। ছিলো না কারও জান-মালের নিরাপত্তা। একটি সমাজ ও জাতি অধপতনের যতটা তলানিতে ঠেকতে পারে তার বাস্তব রূপ ছিলো- জাহেলি যুগ। এমনই একটি মুহূর্তে ইসলামের আগমন ঘটে।

আল্লাহতায়ালা হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর ওহি নাজিল করার পূর্বে তার ওহি ধারণের উপযোগী এবং তদানীন্তনকালের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার পরেই তার ওপর ওহি অবতীর্ণ করেছেন। ন্যয়পরায়ণতা, সহনশীলতাসহ যাবতীয় গুণের আধারে পরিণত ও প্রসিদ্ধ হওয়ার পরেই তিনি নবুওয়ত লাভে ধন্য হন।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন. হজরত রাসূলূল্লাহ (সা.)-এর ওপর সর্বপ্রথম যে ওহির সূচনা হয়। তা ছিল সত্য স্বপ্ন। যা তিনি ঘুমে দেখেছেন। যে স্বপ্ন তিনি দেখতেন তা একেবারে ভোরের আলোর মতো দেদীপ্যমান হয়ে উঠতো। এরপর তার কাছে নির্জনতা প্রিয় করে দেওয়া হতো এবং ‘হেরা’ গুহায় তিনি নির্জনে ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। স্বীয় পরিবারবর্গের প্রতি আগ্রহ আসার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কয়েক রাত পর্যন্ত সেখানে ইবাদত করতেন। এর জন্য তিনি পানাহারের সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যেতেন। 

এরপর হজরত খাদিজা (রা.)-এর কাছে তাশরিফ নিয়ে এসে আবার অনুরূপ সময়ের পানাহার সামগ্রী নিয়ে যেতেন। এমন অবস্থায় তার কাছে হক (তথা ওহিয়ে ইলাহি) এলো। তখন তিনি গারে হেরায় ইবাদতমগ্ন ছিলেন। তার কাছে ফেরেশতা এসে বললেন, পড়ুন; রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমি বললাম- আমি পড়তে পারি না। তিনি বললেন, ফেরেশতা আমাকে জড়িয়ে ধরল এবং এমনভাবে চাপ দিলো- তার চাপ আমার শক্তির শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এরপর সে আমাকে ছেড়ে দিল এবং বলল- পড়ুন। আমি বললাম, আমি পড়তে পারি না। এরপর ফেরেশতা আমাকে আবার ধরল এবং দ্বিতীয়বারও অনুরূপ চাপ দিল। তার চাপ আমার শক্তির সীমাপর্যন্ত পৌঁছে গেল। তারপর সে আমাকে ছেড়ে দিল এবং বলল- পড়ুন। আমি বললাম- আমি পড়তে পারি না। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আবার সে আমাকে তৃতীয়বার এমনভাবে চাপ দিলো- এরপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন- ‘পড়।’ –সহিহ বোখারি: ১/১

মানুষের সংশোধনের জন্য, পৃথিবীতে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ওই মুহূর্তে কী প্রয়োজন- এটা কমবেশি সবারই জানা। জ্ঞানীরা এগুলো নিয়ে কথা বলছেন। তার পরও যদি সমস্যাগুলো একে একে চিহ্নিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়- তাহলে গুরুতর সমস্যাগুলো চিহ্নিত হবে। সেখানে মানব হত্যা ও ব্যভিচারের মতো মারাত্মক পাপের কথাই উঠে আসবে সর্বাগ্রে। 

এভাবে বড় বড় পাপগুলো চিহ্নিত করার পর পর্যায়ক্রমে লঘুপাপসমূহ চিহ্নিত করা যাবে। প্রশ্ন হলো, পাপ তো চিহ্নিত হলো- কিন্তু পাপ থেকে মুক্তির উপায় কী?

আল্লাহতায়ালা সেটাও বলে দিয়েছেন কোরআনে কারিমে। পবিত্র কোরআনের প্রথম আয়াতেই মূল সমস্যাটি বাতলে দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, একটিমাত্র সমস্যার সমাধান করলেই যাবতীয় সমস্যা দূরিভূত হয়ে যাবে। আর সেটি হলো- মূর্খতার সমস্যা। মূর্খতা দূর হলে আর কোনো সমস্যা সমাজে থাকবে না। 

তাই পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম ওহির শব্দ ‘পড়ুন।’ তবে শুধু পড়লেই হবে না, পড়াটি হতে হবে মহান রবের নাম সম্বলিত। এ বিষয়টি আল্লাহতায়ালা কোরআন অবতীর্ণ করার সূচনালগ্নেই উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘পড়, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি (সবকিছু) সৃষ্টি করেছেন।’ -সূরা আলাক

যে মানুষগুলো ছিলো অজ্ঞতা ও মূর্খতার অতল গহ্বরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এবং পাপাচারের সমুদ্রে দিকভ্রান্ত, তারা পবিত্র কোরআনের ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করে মহান রবের নামসমৃদ্ধ শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে নিজেদেরকে সোনার মানুষে পরিণত করেছেন এবং কলুষিত পুঁতিগন্ধময় সমাজকে ঢেলে সাজিয়ে আদর্শ সমাজে উন্নীত করে আগত বিশ্বের সামনে আদর্শ স্থাপন করে গিয়েছেন।

বর্তমান বিশ্বে বিরাজমান অস্থিরতা দূর করতে তাদের আদর্শ গ্রহণের সুযোগ কিন্তু হাতছাড়া হয়ে যায়নি। আসুন, একটি বারের জন্য হলেও সুযোগটি গ্রহণ করে দেখি।
 
লেখক: ইমাম, মুহাদ্দিস ও প্রাবন্ধিক

১০ এপ্রিল, ২০১৭ ১৯:২৪ পি.এম